শেখ তাইজুল ইসলাম, মোংলা (প্রতিনিধি):
আওয়ামী লীগের দুর্গ হিসেবে পরিচিত বাগেরহাট-৩ (রামপাল-মোংলা) আসনে হানা দিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও বাংলাদেশ জামায়াত ইসলাম। এই রাজনৈতিক দল দুটি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনটি নিজেদের দখলে নিতে মরিয়া। যদিও এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারছেনা সেক্ষেত্রে এই দুটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে লড়াই হবে বলে মনে করছেন এ আসনের ভোটাররা।
১৯৯১ সাল থেকে প্রতিটি নির্বাচনে এই আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯৯১ সালে বিএনপি নেতা এএসএম মোস্তাফিজুর রহমানকে হারিয়ে তালুকদার আবদুল খালেক এই আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালেও তালুকদার আবদুল খালেক এই আসন থেকে নির্বাচিত হন। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট গঠন করায় এই আসন থেকে জামায়াত নেতা গাজী আবু বকর সিদ্দিক নির্বাচন করেন এবং তিনি তালুকদার আবদুল খালেকের কাছে হেরে যান। ২০০৮ সালে জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির অ্যাড. আবদুল ওয়াদুদকে হারিয়ে আবারও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তালুকদার আবদুল খালেক।
পরে খুলনা সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার জন্য তালুকদার আবদুুল খালেক সংসদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং উপনির্বাচনে তার সহধর্মিণী বেগম হাবিবুন নাহার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালে তালুকদার আবদুল খালেক এই আসন থেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। পরে ২০১৮ সালের প্রথম দিকে খুলনা সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের জন্য তালুকদার আবদুল খালেক আবারও সংসদ থেকে পদত্যাগ করেন। একই বছর ৪ জুন উপনির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন বেগম হাবিবুন নাহার। ২০১৮ সালের নির্বাচনে জামায়াতের নায়েবে আমির অ্যাড. আবদুল ওয়াদুদকে হারিয়ে আবারও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন বেগম হাবিবুন নাহার। সর্বশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচনেও তালুকদার আবদুল খালেক এর সহধর্মিণী বেগম হাবিবুন নাহার এই আসন থেকে নির্বাচিত হন।
আওয়ামী লীগের এই দুর্গে বিএনপির প্রার্থী লায়ন ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম হানা দিয়ে যেমন আসন পুনরুদ্ধার করতে চান, তেমনি আসনটি পেতে মরিয়া জামায়াতও। জামায়াতের কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে মাঠ-ঘাট দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন প্রার্থী বাগেরহাট জেলা নায়েবে আমির এ্যাডভোকেট মাওলানা শেখ আব্দুল ওয়াদুদ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় ব্যাপক প্রচার প্রচারণা চালাচ্ছেন তারা।
এই সংসদীয় আসনটি আওয়ামী লীগের দুর্গ হলেও ৫ আগস্টে বদলে গেছে এখানকার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। বিগত সরকারের প্রধান শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার পর মামলা-হামলার ভয়ে অনেক নেতা-কর্মীরা আত্মগোপনে চলে যায়। বর্তমানে এ দুটি উপজেলার অধিকাংশ নেতা-কর্মীরা জেলে এবং আত্মগোপনে রয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও জামায়াত ইসলাম তাদের নির্বাচনী মাঠ গোছাতে মরিয়া।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে এই আসনে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচনী মাঠে আছেন বাগেরহাট জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি এবং সেভ দ্যা সুন্দরবন ফাউন্ডেশন-এর চেয়ারম্যান লায়ন ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম। একক প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর বাগেরহাট জেলা নায়েবে আমির এ্যাডভোকেট মাওলানা শেখ আব্দুল ওয়াদুদ।
শুধু বিএনপি ও জামায়াতই নয়, এ আসনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে ইসলামী আন্দোলনের শেখ জিল্লুর রহমান, জাতীয় সমাজ তান্ত্রিক দল (জেএসডি- রব) মো: হাবিবুর রহমান মাষ্টার স্বল্পপরিসরে প্রচার প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
গত বছর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পদধারী অসংখ্য নেতা গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মগোপনে রয়েছেন। ফলে আওয়ামী লীগের এই দুর্গে আওয়ামী লীগই নেই। নির্বাচনি মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থী। এই আসনে ভোটারদের কাছে এখনো অনেকটা অচেনাদের কাতারে ইসলামী আন্দোলন, জাতীয় সমাজ তান্ত্রিক দল (জেএসডি- রব) এর প্রার্থীরা। এমন অবস্থায় নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীর মধ্যে ভোটের লড়াই দেখতে অপেক্ষার প্রহর গুনছেন স্থানীয়রা।
এই আসনে বিএনপির মনোনয়ন পাওয়া লায়ন ড. শেখ ফরিদুল ইসলামের সরাসরি সতন্ত্র হিসেবে বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন বাগেরহাট-২ আসনের সাবেক এমপি বাগেরহাট জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা এম এ এইচ সেলিম।
উল্লেখ্য, লায়ন ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বাগেরহাট জেলা বিএনপির অন্যতম সহ-সভাপতি এবং সেভ দ্য সুন্দরবন ফাউন্ডেশন-এর চেয়ারম্যান হিসেবে দীর্ঘ দিন ধরে এলাকায় আর্তসামাজিক ও পরিবেশ রক্ষায় কাজ করে আসছেন। এলাকায় তার বিশেষ জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।
লায়ন ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলের মানুষ তাদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। ইনশাআল্লাহ, এবারের নির্বাচনের মাধ্যমে রামপাল ও মোংলার মানুষ তাদের প্রিয় প্রতীক ধানের শীষ-এ ভোট দিয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করবেন। নির্বাচিত হলে এই অঞ্চলের উন্নয়ন এবং সুন্দরবন সংলগ্ন মানুষের জীবনমান উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করবেন বলেও জানান তিনি।
জামায়াতের বাগেরহাট জেলা নায়েবে আমির অ্যাডভোকেট মাওলানা শেখ আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, বাংলাদেশ সব ধর্মের মানুষের দেশ। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সবাই মিলেই এ দেশ গড়ে তুলেছে। ন্যায়ভিত্তিক ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠায় জামায়াতে ইসলামী দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সামাজিক মর্যাদা রক্ষায় আমরা সব সময় সোচ্চার ভূমিকা পালন করেছি।
জামায়াতের এই নেতা আরো বলেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, দখলবাজি ও অনিয়মের রাজনীতি বন্ধ করে মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে সৎ, দক্ষ ও আদর্শবান নেতৃত্ব প্রয়োজন। জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে সব নাগরিক সমান অধিকার ও ন্যায়বিচার পাবে—এটাই আমাদের অঙ্গীকার।
স্থানীয়রা জানান, বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থী সবচেয়ে বেশি প্রচার চালাচ্ছেন। তারা উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট চাচ্ছেন। তবে অন্যান্য দলের প্রার্থীরা তাদের দলের কাছে পরিচিত থাকলেও ভোটারদের কাছে অনেকটাই অপরিচিত। তবে নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসায় প্রার্থীরা ভোটের মাঠে কাজ শুরু করেছেন। এলাকায় এলাকায় গিয়ে ভোট চাচ্ছেন।
আসনটি আওয়ামী লীগের দূর্গ বলে পরিচিত হলেও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেখানে আওয়ামী লীগের অনুপুস্থিতির সুযোগে আসনটিতে শেষ লড়াইটা বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যেই হবে বলে মনে করেন স্থানীয়রা।
মাঠে আওয়ামী লীগ না থাকায় প্রচন্ড প্রভাব-প্রতিপত্তী নিয়ে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন বিএনপিসহ সমমনা রাজনৈতিক দলগুলো। বিএনপি মনোনীত প্রার্থী অবাধ সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয় লাভ করবে বলে মনে করছেন স্থানীয় ভোটার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।





কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন